বীজ থেকে হওয়া ছোটো চারা ঘাড় লটকে গেলে কি করবেন ?

সুন্দর ভাবে বীজ জার্মিনেট করে গেলো , আপনিও খুশি , আপনার বীজও খুশি। হটাৎ একদিন সকালে উঠে দেখলেন গাছের ওপরের দিক সতেজ আছে কিন্তু গোড়া থেকে ভেঙে মাটিতে শুয়ে পড়েছে ! কি সমস্যা , কি সমস্যা !
এটাকে ভালো ভাষায় “ড্যাম্পিং এফেক্ট ” বলে।যাঁরা বীজ থেকে চারাগাছ তৈরী করেন, তারা কখনো না কখনো এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন এটা নিশ্চিত!
আজ এটা নিয়েই কিছু কথা বলবো। ভালো করে বুঝে নিলে এই সমস্যা হবে না। কিন্তু একবার হলে এটা থেকে বাঁচা মুশকিল , সব চারাগাছ একসাথে দু তিনদিনের মধ্যে নষ্ট হয়ে যাবে।
আমি গাছ করার সময় খুব একটা পাই না , কিন্তু আমার হাতে বীজ থেকে চারাগাছ খুব ভালো হয়। যেকোনো বীজ আমাকে দিয়ে দিন , জার্মিনেট করে দেখিয়ে দেব। আমি ম্যাজিশিয়ান নই , কিন্তু এমন কিছু জিনিস জানি , যেটা আপনি জানেন না। কিছু ছোটো ছোটো জিনিস মাথায় রাখলে আপনিও বলে বলে বীজ থেকে গাছ করতে পারবেন !
আপনি বলবেন ,”এটা জেনে কি করবো ? কি কাজে লাগবে আমার ?” .একটু পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝাই। ধরুন একটা ভালো জাতের আডেনিয়াম এর গাছ কিনতে চাইছেন , মোটামুটি পাঁচশো টাকা পড়বে। এবার ধরুন আপনি গাছ না কিনে ওই একই গাছের বীজ কিনলেন , পাঁচশো টাকায় পঞ্চাশটা বীজ পাবেন ! এখন আমি যেটা বলবো সেগুলো মেনে চললে পঞ্চাশটা বীজ থেকে পঁয়তাল্লিশ টার বেশি চারা গাছ বানাতে পারবেন। এবার হিসাবটা নিজেই কষুন ! আমি আর কিছু বলছি না।
মোদ্দা কথা গাছ কেনার থেকে বীজ কেনা অনেক অনেক গুণ সস্তা পড়ে। আপনার সময়ের অভাব না থাকলে এর থেকে ভালো জিনিস আর হয় না ! আর তাছাড়া বীজ থেকে গাছ করার একটা আলাদা মজা আছে , সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন দেখবেন মাটি ভেদ করে একটা সবুজ অংকুর আপনাকে “টুকি!” বলছে , সেই আনন্দের কোনো ভাগ হয় না। পারলে আপনার বাচ্চার হাতেও দুটো বীজ দিয়ে দিন , শিখুক কিভাবে বীজ থেকে গাছ হয়। প্রকৃতির থেকে বড়ো শিক্ষক আর কিছু হয় না।
বীজ থেকে চারা গাছ করাটা আসলে একটা আর্ট , আজ কিন্তু সেটা নিয়ে লিখতে বসিনি , আজ চারাগাছ গোড়া ভেঙে নুইয়ে পরার সমস্যা নিয়ে বলবো যেটা খুব কমন , যেটার জন্য অনেকেরই বীজ থেকে গাছ হয় না।
কিন্তু কেনো হয় এটা ? এটা আসলে ফাঙ্গাস লেগে হয়। কোনো একটা ফাঙ্গাস এর জন্য না , বেশ কিছু ফাঙ্গাস এর জন্য এটা হতে পারে। সয়েল বর্ন ফাঙ্গাস( মানে যে ফাঙ্গাস মাটিতে থাকে ) থেকেই এটা হয় , খুব কমন কিছু ফাঙ্গাস আছে যেমন Rhizoctonia ,Fusarium , Pythium এগুলোর জন্য এটা হয়। ফাঙ্গাস এর নাম মনে না রাখলেও হবে কিন্তু এটা অন্তত মাথায় গেঁথে রাখুন যে এটা অনেক রকমের ফাঙ্গাস থেকেই হতে পারে।
আচ্ছা , বড়ো গাছে হয় না কেন ? ফাঙ্গাস তো যা থাকার মাটিতে থাকেই ! তফাৎটা বুঝুন। বীজ থেকে যখন অংকুরটা বেরোয় , তার কান্ডটা খুব নরম থাকে , অন্তত দুটো পরিণত পাতা না বেরোনো পর্যন্ত কান্ডটা শক্ত হয় না । এই নরম কাণ্ডের যে জায়গাটা মাটির সাথে স্পর্শ করে থাকে ওই জায়গাটাতে ফাঙ্গাস লাগলেই আপনার চারাগাছ শেষ।
সেই কারণে দেখবেন ড্যাম্পিং এফেক্ট হলে চারাগাছ টা গোড়া থেকে ভেঙে শুয়ে পরে। এবার হলে একটা চারাগাছ খুব কাছ থেকে দেখুন। দেখবেন একদম গোড়ার কাছটা সরু হয়ে গেছে , রংটাও আর সবুজ নেই , একটু ধূসর রং এর দেখাচ্ছে। দেখলে মনে হবে যেন পচে গেছে। অথচ দেখবেন গাছের ওপরের দিকটা একদম সতেজ আছে ( অন্তত এক দুদিন) . এরকম দেখতে পেলে পাক্কা বুঝবেন ড্যাম্পিং এফেক্ট!
একবার শুরু হলে থামানো মুশকিল , কিছু উপায় আছে , বলছি। কিন্তু আগে থেকে সতর্ক থাকলে কিন্তু এটা এড়াতে পারবেন। তাহলে কি কি করবেন শুনে রাখুন !
(১) মাটিতে বীজ জার্মিনেট করবেন না। মাটিতে ড্যাম্পিং এফেক্ট সবথেকে বেশি হয়। বীজ জার্মিনেট করার মিক্স কিনতে পাওয়া যায় , কিনে নিন। বা নিজের মতো করে মিক্স বানিয়ে নিন , খুব সহজেই বানানো যায় , খুব কম খরচে। বলে দেবো পরের পোস্টে । কিন্তু মাথায় রাখবেন বীজ জার্মিনেট করার সময় মাটি ব্যবহার না করাই ভালো । এটা বলছি দামি গাছ বীজ থেকে জার্মিনেট করার জন্য , যেমন আডেনিয়াম , ক্যাকটাস , সুকুলেন্ট এসব। শাক সবজি মাটিতে ছড়িয়েই সবাই করে।
বীজ থেকে জার্মিনেট করার সময় কোনো সার ব্যবহার করবেন না। অত ছোটো চারাগাছের কোনো সার লাগে না। বীজের মধ্যেই চারাগাছের জন্য খাবার সঞ্চয় করে রাখে , ওতেই খুব ভালোভাবে কাজ চলে যায়। প্রথম পনেরোটা দিন শুধু খেয়াল রাখতে হবে গাছের শিকড় যেন খুব ভালোভাবে ছড়ায়। অনেকে কোকোপিট্ এর সাথে ভার্মি মিশিয়ে বীজ জার্মিনেট করেন , ওটা না করাই ভালো। কোনো কাজের কাজ হয় না , বরং ক্ষতি হওয়ার চান্স থাকে।
(২) একই মিক্স দিয়ে একবার বীজ জার্মিনেট করে নেওয়ার পর আর সেটা ব্যবহার করবেন না। অন্য গাছের গোড়ায় দিয়ে দিন , কিন্তু একই মিক্স দিয়ে বার বার বীজ জার্মিনেট করতে যাবেন না।
(৩) আদ্রতা বেশি থাকলে ফাঙ্গাস এর গ্রোথ বেশি হয় , তাই সারফেস টা শুকনো রাখার চেষ্টা করুন , চারা গাছে ওতো জল লাগে না ! বার বার বলছি মনে একদম গেঁথে নিন , জল খুব অল্প পরিমানে দিন। একটু শুকনো শুকনো ভাব তা বজায় রাখুন। ৯৯% চারা গাছ মরে জল বেশি হয়ে। মিক্সটাও এরকম নেবেন যাতে জল যেন না বসে।
প্রয়োজনে একটু পাখার হওয়া খাইয়ে নিতে পারেন জল দেওয়ার পর, তাহলে সারফেসটা তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে।
(৪) নোংরা জায়গায় বীজ জার্মিনেট করবেন না , জায়গা পরিষ্কার রাখুন। এতে ড্যাম্পিং কম হবে। এমন জায়গায় রাখুন যেখানে হাওয়া চলাচল হয়।
(৫) যার কাছ থেকেই কিনুন , আগে জেনে নেবেন বীজ ফাঙ্গিসাইড দিয়ে ট্রিট করা আছে কিনা, নাহলে বীজের সাথেই ফাঙ্গাস আসবে ! বীজ সংরক্ষণ করাটাও একটা আর্ট। কম দামে কেউ বীজ বিক্রি করছে বলেই হুড়িয়ে কিনে নিলাম , এরকম করলে একটাও বীজ জার্মিনেট না করতে পারে। ফ্লিপকার্ট , আমাজন থেকে নিয়ে অনেকেই ঠকেন। বিশ্বস্ত লোকের কাছ থেকেই বীজ নিন ।
বীজ হাতে পাওয়ার পর নিজে একবার ফাঙ্গিসাইড দিয়ে ট্রিট করে নিন , তারপর বুনবেন। আমি তো তাই করি। কে কিভাবে কতোদিন বীজগুলো রেখেছিলো সেটা জানা সত্যি মুশকিল।
(৬) মিক্সে কেমিক্যাল ফাঙ্গিসাইড ব্যবহার করলে কিছু বীজ আছে জার্মিনেট করতে চায় না। মিক্সে ফাঙ্গিসাইড দিতে চাইলে টাইকোডার্মা ব্যবহার করুন। এটা বায়ো ফাঙ্গিসাইড , আদপেএটা নিজেই একটা ফাঙ্গাস , কিন্তু উপকারী ফাঙ্গাস যেটা অপকারী ফাঙ্গাস কে মেরে ফেলে। বীজ বোনার সময় এটা ব্যবহার করলে ড্যাম্পিং হওয়ার চান্স বহুগুনে কমে যায়।
কম পয়সায় করতে চাইলে দারচিনি গুঁড়ো করে মিক্সে দিয়ে দিন , নিমখোল দেবেন না পাকামি করে। নিমখোল ফাঙ্গাস তারায় ঠিক কথা , কিন্তু নিমখোল একটা সার , ওটা চারাগাছে না দেওয়াই ভালো।
(৭) অনেকে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখে। ওটা করলে পলিথিনে কয়েকটা ফুটো করে রাখবেন , নাহলে আদ্রতা বেশি হয়ে ফাঙ্গাস এর সমস্যা হবে।
চারাগাছে দুটো পরিণত পাতা না বেরোনো পর্যন্ত সতর্ক থাকুন , তারপর কান্ড শক্ত হয়ে যায় বলে আর ডাম্পিং হয় না। গাছের ওপর দেখে কিছু হবে না , গোড়া দেখুন ! কিছু অস্বাভাবিক দেখলেই পাখা চালিয়ে হাওয়া খাওয়ান ! ডাম্পিং শুরু হচ্ছে এই সময় একদম ফার্স্ট স্টেজে ধরতে পারলে সারফেস শুকনো করে দিলেই দেখেছি অনেক চারা বেঁচে যায়। সাথে একটু দারচিনি গুঁড়ো করে ছড়িয়ে দেবেন চারাগাছের গোড়ায়।
মোটামুটি এগুলো করলেই চারাগাছে ডাম্পিং হবে না। কোনো কারণে ডাম্পিং শুরু হয়ে গেলেও সারফেস শুকনো করে আর দারচিনি গুঁড়ো ছড়িয়ে আটকাতে পারবেন। কিন্তু ফার্স্ট স্টেজে ধরা পড়লে সামলাতে পারবেন। সময় খুব কম দেয় , তাই আমার মতে আগে থেকে সতর্ক থাকা ভালো।
এই পোস্টে যেগুলো লিখলাম সেগুলো খুব সাধারণ শুনতে লাগলেও মেনে চললে আপনার হাতেও বীজ ম্যাজিক দেখাবে। কিছু বীজ আছে তাদের নিয়ম একটু আলাদা , যেমন সাইট্রাস জাতের গাছগুলো যেমন পাতিলেবু, কমলালেবু এইসবের বীজ এর ওপরের শক্ত খোসাটা ছাড়িয়ে একটা টিসু পেপার এ মুড়ে এয়ার সিল করে অন্ধকার জায়গায় রাখলে খুব সহজে জার্মিনেট করে। তারপর ধোনে বা পালং এই সব বীজ তিনদিন জলে ভিজিয়ে রেখে তারপর বুনলে জার্মিনেশন রেট খুব ভালো দেয় এরকম কিছু জিনিস আছে। এগুলো করতে করতে শিখে যাবেন।
কিন্তু ওপরে যেগুলো বললাম ওগুলো হলো বীজ থেকে গাছ করার অ আ ক খ ! বেসিক ক্লিয়ার থাকলে বাদে নিজেরাই বুঝে একটু আধটু এদিক ওদিক করে নিজের মতো পদ্ধতি বানিয়ে নিতে পারবেন।
© গাছপাকা।

গাছ নিয়ে এইরকম মূল্যবান টিপস সরাসরি আপনার হোয়াটস্যাপ একাউন্টে পেতে আমাদের "গাছের পাঠশালায়" ভর্তি হতে পারেন। এই পাঠশালায় রোজ গাছ নিয়ে ছোটো ছোটো টিপস শেয়ার করা হয়। খুব সহজে ,কম যত্নে আর কম খরচে গাছ করা সম্ভব ! ভালো গাছ করাটা কোনো রকেট সাইন্স না , কিন্তু সঠিক যত্নটা জানা দরকার আর চর্চায় থাকাটা দরকার।

আমাদের হোয়াটস্যাপ গ্রুপ।

আমাদের হোয়াটস্যাপ গ্রুপ “গাছপাকার গাছের পাঠশালা” ।রোজ একটু একটু করে গাছ করা শিখতে এই গ্রুপে জয়েন করুন।

আমাদের ফেসবুক পেজ।

আমাদের ফেসবুক পেজ “গাছপাকা” । গাছ নিয়ে বিস্তারিত জানতে এই পেজটি ফলো করতে পারেন।

আমাদের ফেসবুক গ্রুপ।

আমাদের ফেসবুক গ্রুপ “গাছের সমস্যার সমাধান ” । আপনার গাছের সমস্যায় পরামর্শ চাইতে এই গ্রুপে পোস্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
× Whatsapp