Share this post:
বাগান করেন অথচ জবা গাছ নেই এমন মানুষ হয়তো হাতে গোনা কয়েকজন। বর্তমানে গোলাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জবার প্রতিও মানুষের আকর্ষণ বেড়েছে। এর অন্যতম একটা কারণ যদি হয় বিভিন্ন প্রজাতির জবা আর তার আকর্ষণীয় রং, তবে অন্য কারণ পরিচর্যার দিক থেকে গোলাপের চেয়ে একটু হলেও সহজ সাধারণ, তবে সেটা প্রজাতি ভেদে। তাই নতুন বাগানিরা অন্তত একটা দুটো জবা তাদের বাগানে আনতেই পারেন। আমরা সাধারণত দেশী প্রজাতির জবা ছাড়া আর যে প্রজাতি গুলো সচরাচর দেখতে পাই সেগুলি হলো ব্যাঙ্গালোর ও পুনে ভ্যারাইটি। তবে বেশ কিছু ট্রপিক্যাল ভ্যারাইটিও এখন বেশ জনপ্রিয়। এই পুনে জবার মূল আকর্ষণ হল গাছ ভর্তি ফুল, তবে সেটা উপযুক্ত পরিচর্যার মাধ্যমেই সম্ভব। এটা কোনো জাদুবলে হয় না, সমস্তটাই একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। লাগাতে হবে।
আসলে বাগানের প্রায় সমস্ত গাছের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য। সঠিক পরিচর্যার সাথে আমাদের ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষাও করতে হয়। এই পরিচর্যার বিষয় নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক গাছ সংক্রান্ত গ্রুপ আছে, সেখানে বিভিন্ন অভিজ্ঞ মানুষের সুপরামর্শ মেনে চলা যেতে পারে। তবে সাথে কিছু নিজের বিচার বিবেচনাকেও কাজে
এবার আসি মূল বিষয়ে। পুনে জবা নিয়ে আমি নিজের কিছু অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চাই। সবার মতোই বিশ্বব্যাপী অতিমারির জেরে গৃহবন্দী দশায় বাগান বিষয়ে একটু বেশি যুক্ত হয়ে পড়ি। তবে এটা নয় যে লক ডাউন থেকে গাছ করা শুরু। আসলে পশু, পাখি, রঙিন মাছের নেশা এসব বংশগত ভাবে বাবার থেকে পাওয়া। কিন্তু গাছপালা নিয়ে তেমন উৎসাহী ছিলাম না, বা বংশগত ভাবে আসেনি। আমাদের এলাকায় প্রতি বছর শীতের মাঝামাঝি নিয়ম করে পুষ্প প্রদর্শনী হয়। সেখানে গাছ ভর্তি এক ঝাঁক চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ ফুলের ভিড়, ফুলের সমারোহে পাতা খুঁজে না পাওয়া বাগানবিলাস এবং আরও কত কি! এসব দেখতে দেখতে ভাবতাম আমিও একদিন এরকম গাছ করব। এরপর এক বন্ধুর সাথে কাছাকাছি নার্সারি থেকে কিছু শীতের মরশুমের গাছ এনে সেগুলো করতে শুরু করি ২০০৮ সাল থেকে। সেই থেকে গাছের নেশা অনবরত বেড়ে চলেছে, তবে সেই অর্থে জ্ঞান ছিল খুব সীমিত। আর সেই সময় এত স্মার্ট ফোন তো দূর, মাল্টিমিডিয়া ফোনই তখন বিলাসিতা। তাছাড়া এখনকার মত ফোনের স্ক্রিনে ডুব দিলে এত ভুরি ভুরি তথ্য হাতের কাছে আসত না। এখানে আরও একটা কথা বলে রাখা ভালো, প্রয়োজনীয় তথ্যের সাথে অপ্রয়োজনীয় ভুল তথ্যও সামনে চলে আসে ইন্টারনেট এর যুগে, আর সে কারণে আগেই নিজের বিচার বিবেচনা কাজে লাগানোর উল্লেখ করেছি।
এরপর সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে স্মার্ট ফোনের সাথে আমিও স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করলাম বাগানের বিষয়ে। আর ভয়ানক মহামারীর কারণে গত বছরের গৃহবন্দী জীবন শুরু, যার ফলে হাতে অঢেল সময় পাওয়া গেল। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার বাগান বিষয়ক বিভিন্ন গ্রুপগুলোর সাথে যুক্ত হতে লাগলাম। বিভিন্ন গাছ দেখার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু মানুষের জবার সম্ভার দেখে লোভ বেড়ে গেল গাছটার প্রতি, নিজের জন্যে বাজার থেকে নিয়ে এলাম দুটি জবা, যার একটি পুনে ভ্যারাইটি আর অন্যটি ব্যাঙ্গালোর।
তবে সেই সময় এই গাছ নিয়ে তেমন অভিজ্ঞতা না থাকায় যে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল, তা আমার মত নতুন গাছ শুরু করলে প্রায় সবাইকেই ভোগ করতে হয়। হ্যাঁ যা ভাবছেন তাই, গাছের গোড়ায় প্লাস্টিক নেটপট। যখন গাছ নতুন টবে বসাব এটা তখন লক্ষ্য করেছিলাম। কিন্তু ওই অনভিজ্ঞতা আর দোটানা! নেটপট কেটে বসাব, নাকি সমেত বসাব এই আর কি। সাধারণত আমি গ্রো-ব্যাগের গাছ টবে বসানোর আগে রুটবলের খুব ধারের মাটি সামান্য আলগা করে দিয়ে বসাই, কিন্তু নেটপটটা দেখে আমার মোটেই সুবিধের ঠেকছিল না। তাই আমি নেটপটের কিছুটা অংশ কেটে শিকড় আলগা করে দিয়েছিলাম সাবধানে। এরপর যেভাবে নতুন গাছ বসানো হয় সেভাবেই বসিয়েছি। সব কিছুই মনে হচ্ছিল যেন ঠিক আছে, অথচ গাছের কোনো পরিবর্তন নেই। প্রায় তিন মাস এমন চলতে থাকল, আর হঠাৎ একদিন লক্ষ্য করলাম গাছের দুটি ডালের মধ্যে একটি শুকিয়ে এসেছে, অথচ বাকি ডালটি ঠিক আছে, সমস্যা কোথায় বুঝতে পারলাম না। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার গাছের গ্রুপ গুলি থেকে সমস্যা বোঝার চেষ্টা করছিলাম ও অভিজ্ঞ মানুষদের পরামর্শ গুলো মেনে চলছিলাম, বলে রাখা ভালো এক দাদার খুঁটিনাটি পরামর্শই আমি সেসময় মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছি। এদিকে আমার গাছও প্রায় মৃত্যুর দিকে ঢলে কাকুতি মিনতি করছে বাঁচতে চাই বলে, অথচ আমি নিরুপায়। এবার বেশ কিছু দিন পর বুঝতে পারলাম আমায় চটজলদি সিদ্ধান্ত নিতেই হবে গাছটা নিয়ে, তাই একটু ভয়ে ভয়েই লেগে পড়লাম গাছ বাঁচানোর কাজে।
প্রথমত গাছটার সমস্যা জানতে পারলাম শিকড়ে। তাই তাকে সবার আগে টব থেকে বের করে নিলাম খুব সাবধানে, আর আগের বার যে কাজটা অসম্পূর্ণ করা ছিল সেটা এবার খুব ধৈর্য্যের সাথে করতে লাগলাম। খুব সাবধানে শিকড়ের সাথে লেগে থাকা মাটির ডেলা জলে ডুবিয়ে ছাড়িয়ে নিলাম। এর পর ধীরে ধীরে নেট পটের অবশিষ্ট অংশ কেটে বাদ দিয়ে, গাছ শিকড় সমেত ছত্রাকনাশক গোলা জলে ডুবিয়ে রাখলাম মিনিট দশেক। তারপর গাছ জল থেকে তুলে শুকিয়ে আসা ডালটা ভালো ভাবে কেটে কাটা জায়গায় ছত্রাকনাশকের প্রলেপ দিলাম। এর পর নতুন করে গাছটা টবে বসিয়ে গোড়ায় হিউমিক অ্যাসিড মিশ্রিত জল ঢেলে দিলাম। তারপর টবের মাটি সহ গাছকে একটা প্লাস্টিক দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে দিলাম, যেটা “আই সি ইউ মেথড” বলে পরিচিত। অতঃপর অপেক্ষার প্রহর গোনা। আর এই সম্পূর্ণ কাজ করতে হয়েছিল এক প্রতিকূল সময়ে, যেসময়ে গাছ তার বৃদ্ধি প্রায় থামিয়ে দেয় বিশ্রাম নেওয়ার জন্যে। এবার প্রতিদিন গাছকে লক্ষ্য রাখা, আর কবে সম্পূর্ণ সুস্থ হবে তার অপেক্ষা। এভাবে চলতে চলতে প্রায় মাস দেড়েক বাদে এক সময় বুঝলাম গাছ এবার নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এবার একে প্লাস্টিক থেকে উন্মুক্ত করার সময় হয়ে এসেছে। তবে সেই অসুস্থ গাছ সেই সময় নিজের ফুলের ডালি মেলে ধরার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু তাকে জোর করেই বিশ্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ছোট ছোট কুঁড়িগুলি বাদ দিয়ে দিই গাছ থেকে। এরপর নতুন দুটি ডালপালা মেলে আবার জানান দেয় সে জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দোরগোড়ায়। ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হওয়ার পর গাছ ফুলসহ নতুন করে মেলে ধরল নিজেকে।
প্রায় তিন মাসের অসম লড়াইয়ে জয়ী এই পুনে জবা বড্ড প্রিয় আমার। জীবন যুদ্ধে আমার অনুপ্রেরণাও বটে। আজ গাছকে নিজের স্বাভাবিক অবস্থায় দেখে মন ভরে যায় খুশিতে, আরও নতুন জবা সংগ্রহ করার উৎসাহও বেড়ে গেছে। ছবির মাধ্যমে আমি এই গাছের পূর্বের এবং বর্তমান অবস্থা বোঝানোর চেষ্টা করলাম। আশা করি আমার এই লেখা পাঠকদেরও নেটপট সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানের পথ দেখাবে।
লেখক/লেখিকা ~ সুমন কুন্ডুসুসুম
ন কুন্ডুমন কুন্ডু
“গাছপাকা”র তরফ থেকে খোলা চিঠি :
প্রিয় পাঠক/পাঠিকা ,
গাছ নিয়ে আমাদের এই ওয়েবসাইটটি ভিজিট করার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আপনি আমাদের “গাছপাকা” পরিবারে যুক্ত হতে চাইলে হোয়াটস্যাপ করুন +916295614885 এই নাম্বারে। এটা হোয়াটস্যাপ অনলি নাম্বার , তাই কল করলে পাবেন না। এই নাম্বারে হোয়াটস্যাপ করলেই আমাদের হোয়াটস্যাপ ব্রডকাস্ট গ্রুপের লিংক পেয়ে যাবেন। ওখানেই টাইম টু টাইম সব আপডেট দেওয়া হয়।
গাছের যত্ন নিয়ে টিপস , আমাদের অনলাইন ওয়ার্কশপ হলে তার এনাউন্সমেন্ট , গাছ সেল করলে সেল রিলেটেড ইনফরমেশন , ফেসবুকে গ্রুপের কোনো ইভেন্ট হলে তার ডিটেলস , “গাছগল্প” পত্রিকার পরের এডিশন এর ডিটেলস সবকিছুই ওখানে টাইম টু টাইম পেয়ে যাবেন।
গাছপালা নিয়ে ভালো থাকুন , সুস্থ থাকুন।
ইতি
গাছপাকা
ফেসবুক পেজ লিংক –> https://www.facebook.com/share/1BBaWXTPvG/