বাগান কী কারও ব্যক্তিগত হয়? ~ মুমিতুল মিম্মা

বিষণ্ণতার ধূসর জগত থেকে মুক্তির পথ হিসেবে আমার বাগান করার শুরু। দিনের পর দিন একের পর এক খোলসে আটকে যেতে যেতে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছিলাম তখন। আমার বারান্দায় রাখা ছিল গোটা পাঁচেক টব। সে টবে ছিল বেলে মাটি। সে মাটি এতো শক্ত যে উল্লেখ করাই বাহুল্য। কেন জানি না সে জিনিস কোনদিন ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়নি। অথচ আমার আশেপাশে অনেক গাছপাগল বন্ধু আছে। বন্ধু লাবণ্য আমাকে পর্তুলাকার দুটো কুচো বাচ্চা আর অ্যালোভেরা দিয়ে হাতে কলমে বাগান করার পথ বাতলে দিল। কিন্তু সাহসটা দিয়েছিল বন্ধু নাবিলা। এই মেয়ে দুইদিনে কীভাবে আমার ভেতর এত সাহস গুঁজে দিল কে জানে! তখনও নাবিলার সাথে আমার দেখা হয়নি। কেবল ইনবক্সে ও ছিল আমার মুক্ত জানালা। হুটহাট ভেতরে কথা জমলে ওকে ইনবক্স করে রাখতাম। স্বগতোক্তির কোন উত্তর হয় না বলে ও মেসেজ সিন করে রেখে দিত। নিজের বাগান নিয়ে ওর লেখা পড়ে পড়ে রোজ টবের মাটি খুঁড়তাম৷ ঐ শক্ত মাটি খুঁড়ে নরম করে আস্তে আস্তে বুনে দিলাম পর্তুলাকার বাচ্চাদুটো আর অ্যালোভেরা তিনটে।

এরপরে লকডাউন শুরু হয়ে গেল। রোজ রাত্তিরে হাঁটতে বেরোতাম। বাংলাদেশে ধীরে ধীরে লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে তখন। ঢাকার বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে চলে গেল। তখনো কেউ জানতো না গ্রামে গেলে বেশ বড় সময়ের জন্যে আটকে যাবে। একদিন হাঁটতে গিয়ে দেখলাম বিল্ডিঙে কে যেন ৬টা মানিপ্ল্যান্টের ঝাড় ঝুলিয়ে দিয়ে কোথায় যেন চলে গেছে। সে গাছে না পড়ে জল, না পড়ে কিছু। গাছগুলো শুকিয়ে একাকার। এত্ত মায়া হল দেখে! রোজ জল নিয়ে যেতাম। বাচ্চাগুলোর কাছে গিয়ে আদুরে দুটো একটা কথা বলতাম। পুরোনো হলদেটে পাতা ছিঁড়ে দিতাম। মাঝেমাঝে আবার দু এক দিন জল না দিয়ে দেখতাম আমি ছাড়াও তাদের কেউ যত্ন করে কিনা। না, কেউ নেই একটুখানি জল দেবার জন্যে৷ অগত্যা আমিই সই৷ যত্নের প্রতিদান হিসেবে তিনটে ডাল ভেঙে নিয়ে এসেছিলাম। মোট ২০ ইঞ্চি সেই ডাল পচতে পচতে দুই ইঞ্চির মতোন দাঁড়াল। গাছের জন্য আমি তখন নতুন নতুন মাটি বানানো শিখছি। তখনও গাছ অনুযায়ী মাটির চাহিদা সম্পর্কে কিছুই জানি না। প্রাথমিক পর্যায়ে কম্পোস্ট বানানো শিখছিলাম। টবে থাকা বালুর সাথে কী কী মেশালে আরও ভালো মাটি বানানো যায় সারাদিন ইউটিউব আর গুগলের কাছ থেকে জেনে নিচ্ছিলাম। কিন্তু গাছ বাঁচাতে না পারার কী দুঃখ আমার! বাঁচাতেই যদি না পারি তাহলে সারাদিন এত ঘাঁটাঘাঁটি করে কী লাভ?

বন্ধুদের কাছ থেকে যা পরামর্শ নিই – সব বিফলে যায়। অনুভূতি আর প্রয়োজন না বুঝে যত্ন করতে গেলে যা হয় আর কী! মানিপ্ল্যান্টের যে দুই ইঞ্চি বাঁচল সেখানে সারাদিন ধরে বসে কী সব এলোমেলো বকতাম! কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না জানেন, স্পর্শ করতে পারছিলাম না তাদের কাউকেই। অবশেষে তারা বাঁচল। আমিও যত্ন থেকে বাহুল্য বাদ দেয়া শিখলাম। খুব যে বাদ দিতে পেরেছি তা অবশ্য নয়, তবু গাছের পাতা দেখলে অন্তত বুঝতে পারি তারা কী চাইছে, তাদের সমস্যা কী।

ও আচ্ছা, সেই গাছগুলোর কথা বলি, লকডাউনে আমি যাদের কেয়ার গিভার হয়েছিলাম। মাস খানেক পরে হুট করে একদিন জল দিতে গিয়ে দেখলাম তারা কেউই সেখানে নেই। হুট করে ভরা সংসার ফাঁকা হয়ে গেলে বাড়ির গিন্নীর যেমন লাগে, আমার ঠিক তেমন লাগছিল। মন ভার হয়ে গেল। ভাবলাম পাশের ফ্ল্যাটে নক করে জেনে নিই তারা সবাই কেমন আছেন। চুপিচুপি এক ফাঁকে জেনে নিই তারা আমাকে মিস করেন কিনা। মনে হল বেশি বেশি হবে সেটা। মাত্র একমাসে এতো মায়া বাড়াতে নেই।

আমি তাদের কে? কেউ না তো! পথে যেতে যেতে কতো মানুষের সাথে আমাদের দেখা হয়, তাদের সবাইকে কি আমরা মনে রাখি? এবারে না হয় গাছের সাথেও দেখা হল। কিন্তু মনের এক ছোট্ট ঘরে তাদের স্মৃতি আমি যত্ন করে তুলে রেখেছি। হুটহাট সেই ঘরখানি খুললেই আমার কেমন কান্না পেতে থাকে!

গাছ আর বই নিয়ে আমার একটা দারুণ বোধোদয় তৈরী করে দিয়েছিলো সেই মানিপ্ল্যান্টের ঝাড়গুলো। আমি কেন তাদের রোজ জল দিতাম, কেন আমি তাদের ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম – তা আসলে জানি না। হুট করে একদিন মাথায় এলো গাছ বা বই কারও নিজের হয়? একটা গাছ হয়তো আমার হতে পারে, কিন্তু সে যে অক্সিজেনটুকু দেয় সবটাই কি আমার জন্যে? বই হয়তো আমার হতে পারে, সে বই অন্য মানুষকে যেভাবে স্পর্শ করে সেটা কী করে আমার হয়? যে বোধ মানুষকে অনন্য করে, সেই ধারকখানি মলাটবদ্ধ হিসেবে আমার কাছে আছে বলে সে আমার? এ আবার হয় নাকি? এরপর থেকে ব্যক্তিগত বাগান, ব্যক্তিগত লাইব্রেরি নীতি থেকে আমি সরে এসেছি। যা সবার জন্যে থাকে, যে জিনিস সবার জন্যে কাজ করে সে জিনিসের অবস্থান ব্যক্তিগত গণ্ডির অনেক ওপরে। ব্যক্তিগত বৃত্তের ছোট পরিধিতে অহেতুক তাকে আটকে রাখতে নেই৷

জগতের আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ!

লেখক/লেখিকা ~ মুমিতুল মিম্মা 



“গাছপাকা”র তরফ থেকে খোলা চিঠি :

প্রিয় পাঠক/পাঠিকা ,

     গাছ নিয়ে আমাদের এই ওয়েবসাইটটি ভিজিট করার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আপনি আমাদের “গাছপাকা” পরিবারে যুক্ত হতে চাইলে হোয়াটস্যাপ করুন +916295614885 এই নাম্বারে। এটা হোয়াটস্যাপ অনলি নাম্বার , তাই কল করলে পাবেন না। এই নাম্বারে হোয়াটস্যাপ করলেই আমাদের হোয়াটস্যাপ ব্রডকাস্ট গ্রুপের লিংক পেয়ে যাবেন। ওখানেই টাইম টু টাইম সব আপডেট দেওয়া হয়। 

     গাছের যত্ন নিয়ে টিপস , আমাদের অনলাইন ওয়ার্কশপ হলে তার এনাউন্সমেন্ট , গাছ সেল করলে সেল রিলেটেড ইনফরমেশন , ফেসবুকে গ্রুপের কোনো ইভেন্ট হলে তার ডিটেলস , “গাছগল্প” পত্রিকার পরের এডিশন এর ডিটেলস সবকিছুই ওখানে  টাইম টু টাইম পেয়ে যাবেন। 

গাছপালা নিয়ে ভালো থাকুন , সুস্থ থাকুন। 

ইতি 

গাছপাকা 

ফেসবুক পেজ  লিংক  –> https://www.facebook.com/share/1BBaWXTPvG/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
× Whatsapp