Share this post:
Post Views: 601
সকালে ঘুম থেকে উঠতে খুব কষ্ট হচ্ছিল । এমনিতে আমি কোনোকালেই খুব সকালে ওঠা পছন্দ করিনা । অভ্যাসটা সেই কলেজ লাইফ থেকেই…
রাত জাগতে সমস্যা হয়না , কিন্তু সকালে উঠতে গেলেই রাজ্যের বিরক্তি চলে আসে।
আসলে গত দুমাস শারীরিক ভাবে প্রচুর পরিশ্রম হচ্ছে। অফিস চেঞ্জ হয়েছে.. ওয়ার্ক ফ্রম হোম লাটে উঠে গেছে। নতুন প্রজেক্ট, নতুন অফিস , নতুন লোকজন … ফ্যমিলি নিয়ে শিফট করার তোড়জোড় … নিউটাউন, তারকেশ্বর যাতায়াত ….সব মিলিয়ে একদম ল্যাজে গোবরে হয়ে আছি।
কিন্তু কথা দিয়ে রাখতে না পারার একটা আলাদা যন্ত্রণা আছে। একজনকে কথা দিয়েছিলাম বাড়ি গিয়ে ফুল সমেত অর্কিড দিয়ে আসবো।
তারকেশ্বর থেকে ড্রাইভ করে গেলে প্রায় এক ঘন্টা । ওনার সাথে পরিচয় অনেক দিন আগে। পদ্ম গাছ নিয়েই আলাপ।
পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছেন যাদের কাছে গেলে একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়। ছোটোখাটো মানুষ , মুখে সবসময় হাসি লেগেই আছে। খুব ইজি গোয়িং টাইপের মানুষ ।
প্রথম দিনেই বড্ড আপন করে নিয়েছিলেন । জোরজবরদস্তি ব্রেকফাস্ট করে খাওয়ানো । গাছের আম উপহার দেওয়া। আজকালকার দিনে এসব কে করে !
বাড়িতে কতো গাছ। বড়ো উঠান,কিন্তু পুরোটা বড়ো বড়ো গাছের ক্যানোপি দিয়ে ঘেরা। আম গাছই বেশি।
তখন ছিল গরমকাল। রোদে ঘেমে নেয়ে বাড়িটায় ঢুকতেই আহ কি শান্তি ! আসলে মানুষ আর গাছপালার মধ্যে সম্পর্কটা বহু পুরাতন। এককালে মানুষের যখন ঘরবাড়ি ছিলো না , গাছের ডাল টাই ছিলো মানুষের ঘরবাড়ি। আমাদের জিনের মধ্যে , রক্তের মধ্যে সেই ভালোলাগা আজও আছে। কোনোদিন সম্ভব হলে খুব পুরাতন কোনো বড়ো গাছকে আঁকড়ে ধরে চোখ বুঝবেন… দেখবেন অন্য রকম অনুভুতি হবে।
যাইহোক , সেটাও ধরুন আজ থেকে হবে বছর খানেক কি বছর দুয়েক আগের কথা। ওই বড়ো বড়ো পুরাতন গাছগুলো দেখে বলেছিলাম যে কিছু ভালো অর্কিড এনে এই গাছের ডালে বেঁধে দেবো।
তারপর আজ নয় কাল , কাল নয় পরশু করতে করতে আর হয়ে ওঠেনি ।
বড়ো গাছে অর্কিড বেঁধে দেওয়ার কিছু প্র্যাক্টিকাল এডভান্টেজ আছে। যেমন ধরুন গাছ ধরে গেলে সারা বছর না লাগবে জল দিতে , না লাগবে সার। বিনা যত্নে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ফুল দিয়ে যাবে।
আপনার নাতি পুতিদের নাতি পুতিরাও ওই একই গাছে ফুল দেখবে। আর অর্কিড এর ফুল অনেক দিন থাকে… এক মাসের ওপর ।
অর্কিড কিন্তু এপিফাইট, প্যারাসাইট না। প্যারাসাইট এর মতো এরা হোস্ট গাছের থেকে পুষ্টি নেয় না। তাই হোস্ট গাছের কোনো ক্ষতি এরা করেনা। তাই কোনো গাছে বাঁধতে চাইলে নিশ্চিন্তে বাঁধতে পারেন।
কোন গাছে বাঁধবেন তার কিছু নিয়ম আছে । যে গাছের ছালে ফাটল দেখতে পাবেন , সেটাই অর্কিড এর জন্য আদর্শ। যেমন বড়ো আম গাছ , শিরীষ গাছ .. এইসব। গাছের ছালে ফাটল থাকলে অর্কিড এর শিকড় খুব ভালোভাবে গাছকে আঁকড়ে ধরতে পারে।
কোন জায়গায় বাঁধবেন তারও কিছু নিয়ম আছে। “V” আকৃতির কোনো ডাল দেখতে পেলে ওই জায়গায় বেঁধে দিলে গাছ অনেকটা বড়ো হয়ে গেলেও খুব ভালো সপোর্ট পায়। তাছাড়া বৃষ্টির জল খানিকটা করে ওই “V” er মধ্যে জমা হয় বলে অর্কিড ওই জায়গা থেকে নিজের জলের চাহিদা মিটিয়ে নেয়।
অর্কিড দুপুরের চড়া রোদটা সরাসরি লাগাটা পছন্দ করে না। তাই গাছের গুড়ির কাছাকাছি মাউন্ট করাটাই সবথেকে ভালো । এমন জায়গা বাছুন যেখানে কিছুটা আলো কিছুটা ছায়া পাবে ।
সবসময় মনে রাখবেন , এটা এক দুদিন এর ব্যাপার না। গাছটা ওখানে কয়েকশো বছর থাকবে! তাই মাউন্ট করার আগে ভালো করে আগে জায়গা বাছুন।
কিন্তু অর্কিড টা খাবে কি? পাখি , হনুমান এসে পটি করবে , বর্ষা কালে কিছু পোকামাকড় মরে পড়ে থাকবে। এগুলো থেকেই প্রাকৃতিক ভাবে গাছটা খাবার নেবে।
নর্থ বেঙ্গল গেলে দেখবেন , এইভাবেই অর্কিড বড়ো গাছের ওপর হয়ে থাকে। অনেকে আবার তুলে নিয়ে চলে আসেন …এটা করবেন না। এই ভাবেই নর্থ বেঙ্গল এর অর্কিড এর বায়ো ডাইভারসিটি আমরা নষ্ট করে ফেলছি। ওই অর্কিড গুলো স্পিসিস অর্কিড , জ্ঞান না থাকলে , খুব খুব এক্সপারটাইস না থাকলে গরমকালে আমাদের এখানে বাঁচাতে পারবেন না ।
হাইব্রিড অর্কিড আমাদের আবহাওয়া তে খুব ভালো হয়। আর স্পিসিস অর্কিড একটা মেরে ফেলা মানে অমার্জনীয় অপরাধ । স্পিসিস অর্কিড তখনই করুন যখন আপনি জানেন কিভাবে তাকে যত্ন নিতে হয় ।
অর্কিডটা কোথায় মাউন্ট করবেন জায়গা ঠিক হয়ে গেলে এবার গাছটাকে ভালো করে বাঁধুন। দড়ি চ্যাপ্টা প্লাস্টিক এর দড়ি নেবেন, কারণ জল পড়লে অন্য দড়ি পচে নষ্ট হয়ে যাবে । দড়ি দিয়ে অর্কিড টাকে ওই হোস্ট গাছের সাথে ততদিন বেঁধে রাখতে হবে যতোদিন না অর্কিড টা হোস্ট গাছকে শিকড় দিয়ে খুব ভালোভাবে আঁকড়ে ধরে।
বর্ষার শুরুর দিকটা অর্কিড মাউন্ট করার সবথেকে ভালো সময় । শুধু তাই না , অন্য সময় অর্কিড মাউন্ট করলে অনেক সময় লাগে অর্কিডটা ঠিকঠাক মাউন্ট হতে। তাই জুলাই মাস ছাড়া অন্য সময় অর্কিড গাছে মাউন্ট করবেন না।
অর্কিড বড়ো গাছে বাঁধার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো ঠিক কতটা চাপ দিয়ে বাঁধবেন । চাপ বেশি হয়ে গেলে শিকড় ড্যামেজ হয়ে যাবে। চাপ কম হলে গাছ নড়বে …গাছ নড়লে অর্কিডটা হোস্ট গাছকে শিকড় দিয়ে আঁকড়ে ধরতে পারবে না।
একটা উদাহরণ দিই। কোনোদিন মা বিড়ালকে বাচ্চাকে ঘাড় ধরে নিয়ে যেতে দেখেছেন ? বাচ্চাকে ঘাড় ধরে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি লাফিয়ে চলে যাচ্ছে , অথচ বাচ্চাটার কোনো ক্ষতি হচ্ছে না, ঘাড়ে দাঁত বসছে না।
ঠিক ওইরকম চাপটাই লাগবে। জিনিসটা সহজ না , তবে খুব কঠিন ও না । একটু সময় নিয়ে করতে হবে এই যা , তাড়াহুড়ো করলেই মুস্কিল । প্রথমবার করলে অবশ্যই অন্য কাউকে গাছটা ধরতে বলুন , নাহলে সামলাতে পারবেন না।
যাইহোক আমার অর্কিড মাউন্ট করার অভ্যাস বহুদিনের। অনেক বড় বড় বাগানি দের থেকেও আমি ভালো অর্কিড মাউন্ট করতে পারি। তাই ভেবেছিলাম ওই তো ছয়টা গাছ। যাবো , মাউন্ট করবো , চলে আসবো।
যেতেই শুনলাম উনি দুতলার বেডরুম এর জানালা থেকে অর্কিড গাছ দেখতে চান। এখন দুতলার জানলা থেকে জানলার পাশে অর্কিড দেখতে পাওয়া মানে আমাকে গাছে উঠে দুতলার হাইটে গাছটা বাঁধতে হবে !
মানে গাছে উঠতে হবে !
ছোটবেলায় আমি ছিলাম গাছে ওঠাতে ওস্তাদ। বড়ো বড়ো গাছ , এমনকি নারকেল গাছ , তাল গাছ , সুপারি গাছেতে তরতরিয়ে উঠে পড়তাম ।
কিন্তু সেটা তো ছেলেবেলায়! চল্লিশ ছুঁই ছুঁই বয়সে গাছে উঠে স্লিপ খেয়ে পড়লে এই বুড়ো হাড় জুড়বে তো?
ওনারা জোর করেননি । কিন্তু এরকম স্বপ্ন দেখার মতো মানুষজন আজ সত্যি বিরল ! থাইল্যান্ড এর সমুদ্র সৈকতে বসে ওয়াইন এর গ্লাসে চুমুক দেবো এরকম স্বপ্ন তো সবাই দেখে……এই স্বপ্নের কোনো কোয়ালিটি নেই ।
কিন্তু পড়ন্ত বিকালে দুতলার জানলা থেকে গাছে বাঁধা অর্কিডের ফুল দেখবো…এই মানুষগুলো সত্যি আলাদা হয়।
যা হয় হবে এই ভাবতে ভাবতে হেলমেটটা পড়ে নিলাম , হাত পা ভাঙলে সেরে যাবে। মাথা ভাঙলে মুস্কিল আছে!
বেঁধে দিলাম দোতলার জানলার সামনে দুটো ফুল সমেত অর্কিড । আর বাঁধার পরই বৃষ্টি ! মনে হলো ওপর থেকে কেউ যেনো আশীর্বাদ করলো …. মানুষের স্বপ্ন পূরণ করার একটা আলাদাই শান্তি।
যে একবার গাছে চড়তে জানে, সে বোধহয় জীবনে কোনোদিন ভোলে না। সেই বাচ্চা বেলার দুরন্ত স্কিল এই চল্লিশ ছুঁই ছুঁই বয়সে আজও একইরকম আছে দেখে নিজেই অবাক!
খুব সুন্দর অর্কিড গুলো বাঁধা হয়েছে। বোধহয় এটাই আমার বেস্ট । সময়টাও ঠিকঠাক , জায়গাটাও একদম পারফেক্ট । অর্কিড গুলো এর থেকে ভালো জায়গা বোধহয় পেতো না।
দুবছর আগে দেওয়া একটা পুরানো কথা পূরণ করতে পেরে সত্যি মনটা শান্তি পেয়েছে।
কথা দিয়ে কথা রাখবো না , এরকম মানুষ আমি নই।তাই এখন কাউকে চট করে কথা দিই না। মাথা না থাকলে মাথাব্যথাও থাকবে না ।
যাঁরা এটাকে একটা নিছক গল্প হিসাবে পড়লেন , তাঁরা আরও একবার ভালকরে পড়ুন । অর্কিড মাউন্ট করার পুরো পদ্ধতি বলা আছে… আর যে বলেছে সে কিন্তু অর্কিড মাউন্ট করার ওস্তাদ 
গাছ নিয়ে স্বপ্ন দেখুন… আপনার বাচ্চার মনে এইসব স্বপ্নের বীজ বুনে দিন। নাহলে বড়ো হয়ে বাচ্চাগুলো কি নিয়ে বাঁচবে?
© গাছপাকা।
গাছ নিয়ে এইরকম মূল্যবান টিপস সরাসরি আপনার হোয়াটস্যাপ একাউন্টে পেতে আমাদের "গাছের পাঠশালায়" ভর্তি হতে পারেন। এই পাঠশালায় রোজ গাছ নিয়ে ছোটো ছোটো টিপস শেয়ার করা হয়। খুব সহজে ,কম যত্নে আর কম খরচে গাছ করা সম্ভব ! ভালো গাছ করাটা কোনো রকেট সাইন্স না , কিন্তু সঠিক যত্নটা জানা দরকার আর চর্চায় থাকাটা দরকার।
আমাদের হোয়াটস্যাপ গ্রুপ।
আমাদের হোয়াটস্যাপ গ্রুপ “গাছপাকার গাছের পাঠশালা” ।রোজ একটু একটু করে গাছ করা শিখতে এই গ্রুপে জয়েন করুন।
আমাদের ফেসবুক পেজ।
আমাদের ফেসবুক পেজ “গাছপাকা” । গাছ নিয়ে বিস্তারিত জানতে এই পেজটি ফলো করতে পারেন।
আমাদের ফেসবুক গ্রুপ।
আমাদের ফেসবুক গ্রুপ “গাছের সমস্যার সমাধান ” । আপনার গাছের সমস্যায় পরামর্শ চাইতে এই গ্রুপে পোস্ট করুন।