পদ্ম গাছ নিয়ে মানুষের কিছু ভুল ধারণা – দ্বিতীয় পর্ব।

আগের পর্বটা অনেকেই পছন্দ করেছেন দেখলাম। লাইক কমেন্টের বন্যা বয়ে গেছে একদম! পঞ্চাশটা শেয়ার হলে দ্বিতীয় পর্ব লিখবো জানিয়েছিলাম ,চেক করে দেখি ৬৮৪ টা শেয়ার!তাই আজ “পদ্ম নিয়ে কিছু ভুল ধারনা” পর্ব ২ ।
১. পদ্ম গাছ থাকলে সাপ আসবে ।
– ডাহা মিথ্যে কথা। বরং পদ্মের পাতা বা ফুলের ডাটির গায়ে যে সূক্ষ সূক্ষ কাঁটা থাকে সেগুলো সাপ এড়িয়ে চলে , ওদের চামড়া ছিঁড়ে যায়। এক কাজ করুন, বাজার থেকে একটা পদ্ম ফুল কিনে এনে চোখ বুঝে ডাটির গায়ে হাত বুলিয়ে দেখুন , নিচে থেকে ওপরে । কি বললাম হাড়ে হাড়ে টের পাবেন । একবার হাত বুলালেই বুঝে যাবেন কেনো সাপ পদ্ম গাছ পছন্দ করে না।
২. গামলায় পদ্ম গাছ করলে ছাদ নষ্ট হয়ে যাবে।
– ছাদ নষ্ট হয় যদি দিনের পর দিন ছাদে জল জমে । পদ্ম বা ওয়াটার লিলি যেহেতু মানুষ ফুটো না দেওয়া জায়গায় করেন , তাই কোনো সমস্যা নেই । অনেকে দুটো বা তিনটে ইট রেখে তার ওপর গামলা রাখেন । রাখলে রাখুন , কিন্তু এতে উপকার বা অপকার কোনোটাই হবে না।
গোলাপ বা জবা জাতীয় গাছ ছাদে রাখলে অবশ্যই স্ট্যান্ড এর ওপরে রাখুন। কারণ এই গাছগুলোতে আপনাকে রোজ জল দিতে হবে, জল দিলেই নিচে দিয়ে জল বেরিয়ে ছাদ ভেজাবে । ছাদ ভিজলে সমস্যা নেই, কিন্তু যেনো শুকিয়ে যায় সেটা খেয়াল রাখবেন। সকালে জল দিলে এক দুঘন্টার মধ্যে ছাদ শুকিয়ে যায়, তাই গোলাপ , জবার মতো গাছ ছাদে রাখলে সকালে গাছে জল দিন।
৩. রোজ জল ওভারফ্লো করতে হয় ।
– এটা যে আবিষ্কার করেছিলো তার নাম জানতে পারলে দুটো থাপ্পড় লাগিয়ে আসতাম। যখন কম গামলা ছিলো , ওই দশ বারোটা, তখন রোজ এই করে সময় নষ্ট করতাম। জীবনের কতোগুলো ঘণ্টা এই বেকার কাজটা করতে করতে কাটিয়েছি তার কোনো হিসাব নিকাশ নেই ।
কোনো প্রয়োজন নেই। যতো ওভারফ্লো করবেন ততো নিউত্রিএন্ট জলের সাথে পট থেকে বেরিয়ে যাবে। রোদে জল শুকিয়ে গেলে যেটুকু জল কমবে সেটুকু জল দিয়ে ভরে দিন , তাহলেই যথেষ্ট। আমি সারা বছরে একদিনও জল ওভারফ্লো করি না। যথেষ্ট ভালো গাছ হয় আমার । বরং দেখেছি জল ওভারফ্লো না করলে পুরানো জলে বেশি ভালো গাছের গ্রোথ হয়।
খোল দিয়ে তিন চারটে গাছ করে দেখলাম , জল পচে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। এইরকম জল গামলায় থাকলে গাছের ক্ষতি করবে। তাই খোল দিয়ে পদ্ম গাছ করতে চাইলে জল ওভারফ্লো করার ব্যাপারটা কিন্তু থাকবে। গোবর সার বা ভার্মিকম্পোস্ট দিয়ে গাছ করলে এইরকম জল পচে যায় না।
৪. বীজ এর গাছে ফুল হয় না।
– এটাও অর্ধসত্য। তিন মাসের মধ্যেই হাইব্রিড প্রজাতির গাছের বীজ থেকে গাছ হয়ে ফুল চলে আসে। তবে যে গাছের বীজ , ফুল সেই গাছের মতো না হওয়ার চান্স অনেকটাই। আর দশকর্মার দোকান থেকে বীজ কিনলে ওটা ইন্ডিয়ান নেটিভ ভ্যারাইটির বীজ হওয়ার চান্স ৯৯.৯৯%। এই বীজ থেকে গাছ করলে কবে ফুল পাবেন কোনো গ্যারান্টী নেই , অনেককে দেখেছি তিন চার বছরেও ফুল পাননি।
প্রথম বার পদ্ম গাছ করলে রাইজোম কিনে করুন , মোটামুটি পঁয়তাল্লিশ দিনের মধ্যেই গাছ হয়ে কুঁড়ি দেখতে পেয়ে যাবেন। তাড়াতাড়ি ফুল না পেলে উৎসাহটাই চলে যাবে।
৫. রানার থেকে বেশি ভালো গাছ হয়।
এটাও অর্ধসত্য। এসব বলে কেউ রানার আপনাকে সেল করতে চাইলে দুবার ভেবে দেখুন। রানার থেকে গাছ করতে হলে এক্সপেরিয়েন্স লাগে। কয়েক হাজার গাছ করার পরও আমার হাতে এখনও একশোটা রানার এর মধ্যে কুড়িটা মরে। আপনি অনভিজ্ঞ হলে একশোটার মধ্যে একশো টাই মেরে ফেলবেন । প্রথমবার করলে রানার কিনবেন না । হেলদি টিউবার কিনুন।
৬. গামলায় আজলা বা ফ্লোটিং প্ল্যান্ট রাখতে হয়।
পদ্মের গামলায় ফ্লোটিং প্ল্যান্ট রাখার কিছু অ্যাডভান্টেজ,কিছু ডিসঅ্যাডভান্টেজ আছে। যেকোনো ফ্লোটিং প্ল্যান্ট জল থেকে নিউট্রিশন নিয়ে বেঁচে থাকে। তাই ফ্লোটিং প্ল্যান্ট বেশি থাকলে নিউট্রিশন ড্রেনেজ হবে। কন্টেনারে পদ্ম গাছ করলে আমি বলবো খুব গরমের সময়টা ছাড়া গামলায় ফ্লোটিং প্ল্যান্ট না রাখাই ভালো । গাছ ছোটো থাকলে ফ্লোটিং প্ল্যান্ট রাখলে গাছের গ্রোথ স্লো হয়। মোদ্দা কথা কখন রাখবেন আর কখন রাখবেন না এটা ক্লিয়ার না হলে না রাখাই ভালো। রাখলেও কোনোভাবেই গামলায় ৬০% এর বেশি ফ্লোটিং প্ল্যান্ট রাখবেন না।
৭. পদ্ম গাছের পাতা কাটলে গাছের গ্রোথ ভালো হয়।
এটাও খুব ভুল ধারণা। অনেককেই কাটতে দেখেছি। খারাপ না হওয়া পর্যন্ত পাতা কাটবেন না। কাটলেও জল এর দু ইঞ্চি ওপর থেকে কাটবেন। জলের নিচে পাতার ডাটি কাটলে জল ঢুকে নিচের রাইজোম এর ক্ষতি করবে ।
অনেকে স্ট্যান্ড লিফ এলে কয়েন লিফ বা ফ্লোটিং লিফ কেটে ফেলেন, এটাও গাছের গ্রোথ স্লো করে দেয়।
তবে যতো ইচ্ছা ফুল তুলুন। যতো ফুল তুলবেন , গাছ ততো বেশি ফুল দেবে। গাছে বীজ রাখবেন না, বীজ থাকলে গাছ ফুল দেওয়া কমিয়ে দেবে।
৮. DAP, লাল পটাশ দিলে দূর্দান্ত গাছ হবে ।
DAP, লাল পটাশ ছাড়াও দুর্দান্ত গাছ হয়। এই সার বেশি হয়ে গেলে গাছ পটল তুলবে। অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ ছাড়া এইসব সার গাছে দেবেন না ।
৯. প্রতি বছর নতুন মাটি লাগবে ।
পুরানো মাটিতে সবথেকে ভালো গাছ হয়, যদি না আগের বছর যথেচ্ছ রাসায়নিক সার দিয়ে মাটির বারোটা বাজিয়ে রেখে থাকেন। পরিমাণ মতো সার দিয়ে থাকলে নতুন মাটির থেকে পুরানো মাটিতে গাছ বেশি ভালো হয় ।
১০. একশো টাকার গামলায় পদ্ম গাছ করতে হয়।
গামলায় মাপ যে টাকায় বোঝানো যায় এটা একমাত্র বাঙ্গালীরাই পারে ! আমি আবার গামলার সাইজ ইঞ্চিতে ছাড়া বুঝতে পারি না।
একশো টাকার গামলা মানে ওই আঠারো ইঞ্চি ডায়ামিটার, দশ ইঞ্চি ডেপথ এরকম গামলা সবাই বোঝেন।
একশো টাকার গামলা মাথা থেকে মুছে ফেলুন। হয় ভ্যারাইটি হিসাবে গামলার মাপ নিয়ে গামলা কিনুন বা গামলার সাইজ হিসেবে ভ্যারাইটি নিন। সব ভ্যারাইটি সব সাইজের গামলায় ভালো হয় না ।
পদ্ম নিরঝঞ্ঝাট গাছ, খুব কম যত্নের গাছ। ঠিকঠাক পটে , ঠিকঠাক ভাবে মিডিয়া তৈরি করে বসিয়ে দিলে খুব কম যত্নে পরের পর ফুল দিয়ে যাবে । বাড়ি তালা দিয়ে দশ দিন কোথাও ঘুরতে চলে গেলেও গাছ বিন্দাস থাকবে।
বাড়িতে পদ্ম গাছ থাকা শুভ । অনেকে তাই মানে, আমিও মানি। অনেককেই দেখেছি বাড়িতে পদ্ম গাছ রেখে সুফল পেয়েছেন। হিন্দু ধর্মে, বৌদ্ধ ধর্মে এই গাছকে পবিত্র মানা হয়। অনেক দেবদেবীর আসন পদ্মাসন, অনেক দেবদেবীর হাতে থাকে পদ্ম ফুল। বৈদিক মন্ত্রে আত্মাকে বর্ণনা করা হয়েছে হৃদপদ্ম বলে। উদাহরণ দিতে গেলে একটা বই লেখা হয়ে যাবে ।
মোদ্দা কথা , বিশ্বাস করলে করুন, না করলে না করুন। ধর্ম আর বিশ্বাস যে যার নিজের নিজের । বিশ্বাস বা অবিশ্বাস দুটোই ঠিক আছে । এটাকে আর পাঁচটা গাছের মতো দেখতে পারেন বা আপনার মন চাইলে একে দেবী হিসাবে পূজাও করতে পারেন।
ছবির এই ভ্যারাইটিটার নাম “বুচা” । একটা অসাধারন ভ্যারাইটি। নভেম্বরে যখন সব গাছ ঠান্ডা হাওয়াতে ফুল দেওয়া বন্ধ করে দেয়, ইনি তখনও জেগে থাকেন । অনেক পুরানো ভ্যারাইটি, কিন্তু টাইম টেস্টেড!
© গাছপাকা।

গাছ নিয়ে এইরকম মূল্যবান টিপস সরাসরি আপনার হোয়াটস্যাপ একাউন্টে পেতে আমাদের "গাছের পাঠশালায়" ভর্তি হতে পারেন। এই পাঠশালায় রোজ গাছ নিয়ে ছোটো ছোটো টিপস শেয়ার করা হয়। খুব সহজে ,কম যত্নে আর কম খরচে গাছ করা সম্ভব ! ভালো গাছ করাটা কোনো রকেট সাইন্স না , কিন্তু সঠিক যত্নটা জানা দরকার আর চর্চায় থাকাটা দরকার।

আমাদের হোয়াটস্যাপ গ্রুপ।

আমাদের হোয়াটস্যাপ গ্রুপ “গাছপাকার গাছের পাঠশালা” ।রোজ একটু একটু করে গাছ করা শিখতে এই গ্রুপে জয়েন করুন।

আমাদের ফেসবুক পেজ।

আমাদের ফেসবুক পেজ “গাছপাকা” । গাছ নিয়ে বিস্তারিত জানতে এই পেজটি ফলো করতে পারেন।

আমাদের ফেসবুক গ্রুপ।

আমাদের ফেসবুক গ্রুপ “গাছের সমস্যার সমাধান ” । আপনার গাছের সমস্যায় পরামর্শ চাইতে এই গ্রুপে পোস্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
× Whatsapp