মাটির পি এইচ ও গাছের খাবার~ জীবেশ কুমার সাহা 

বিয়ে বাড়ীর অনুষ্ঠানে ব্যাপক খাওয়ার আয়োজন। ভালো ভালো সব খাবার। তবে খেতে গিয়ে কেউ তৃপ্ত না। সব খাবার গুলোই কেমন নোনতা। খাওয়া যাচ্ছে না একেবারেই। আমাদের তো এমন হয়। আর গাছের ক্ষেত্রে? গাছের খাবার দেওয়ার সময়, তাহলে নুন টেস্ট করে দিতে হয়? আমরা তো বলতে পারি, নুন কম বেশী হয়েছে। গাছ পারে না। সেটা বুঝতে হবে আমাদেরই।

হ্যাঁ, এই নুনের ব্যাপারটা গাছের ক্ষেত্রেও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। না হলে বিয়েবাড়ির সমস্ত খাবার নষ্ট হওয়ার মতো, গাছে দেওয়া সার-খাবার সবই বিফলে। বাস্তবে তাই হয়, আমরা বুঝতে পারি না। নানা রকম সার দেওয়ার পরও গাছের উন্নতি কেন হয় না। গাছের ক্ষেত্রে নুনের ব্যাপারটা হলো ‘মাটির পি এইচ’। ঠিকঠাক পি এইচ না হলে, সব খাবার জলের সাথে বেরিয়ে যায়।

পি এইচ ব্যাপারটা সংক্ষেপে হলো মাটির অম্ল-ক্ষারের মাত্রা। পাতি বাংলায় এটুকু জানলেই হবে, পি এইচ ৭ মানে মাটি প্রশম (neutral)। না আম্লিক (acidic) না ক্ষারীয় (alkaline)। সাতের বেশী মানে ক্ষারীয়, সাতের কম হলে আম্লিক। এটুকু না হয় জানলাম। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগ কেমন? ব্যবহারিক ধাপগুলো মোটামুটি এরকম,

১) মাটির পি এইচ জানা

২) গাছের কোন পি এইচ দরকার সেটা বোঝা

৩) মাটির পি এইচ নিয়ন্ত্রণ করা

খুব সাধারণ ও ঘরোয়া ভাবে এগুলো করা যায়। প্রথমতঃ পি এইচ জানার উপায় তিন ভাবে হতে পারে। মাটির নমুনা নিকটবর্তী কৃষি দপ্তরে নিয়ে গিয়ে চেক করা। চাষের জমির ক্ষেত্রে, চাষিরা এটাই করে থাকেন। ঘরোয়া উপায় হলো, পি এইচ মিটার কিনে নেওয়া, অথবা পি এইচ পেপার স্ট্রিপ ব্যবহার করা। ডিজিটাল পি. এইচ মিটারের দাঁতটা ভেজা মাটিতে ঢুকিয়ে দিলেই ডিজিটাল রিডিং পাওয়া যায়। আর, তৃতীয় ও সহজতম উপায় হলো, বাগান বা টবের তিন-চার জায়গা থেকে আলাদা আলাদা স্যাম্পেল নেওয়া। প্রতিটি স্যাম্পেলের মাটি একটু ভিজিয়ে নিতে হবে। সেই ভেজা স্যাম্পেলে আলাদা করে পি এইচ পেপার স্ট্রিপ টাচ্ করালেই মাটির পি এইচ অনুসারে স্ট্রিপের কালার দেখাবে। কালার তালিকা অথবা চার্ট থেকে, কালার মিলিয়ে পি এইচ জেনে যাওয়া। সব শেষে সব স্যাম্পেল গুলোর গড় অথবা অ্যাভারেজ ভ্যালু নিলেই হল।

এবারে দেখা যাক, গাছের কোন মাত্রার পি এইচ দরকার। সাধারণ ভাবে গাছ পছন্দ করে, ৫.৫-৬.৫ মাত্রার পি এইচ। “সাধারণ ভাবে” কথাটা বললাম কারণ, অনেক সময় সার বা খাবারের উপর নির্ভর করে কত পি এইচ হলে ভালো হয়। একটু উদাহরণ না দিলে, বোঝা যাবে না। এন পি কে’ র ব্যাপারে সবাই জানি। নাইট্রোজেন, ফসফরাস আর পটাশিয়াম। গাছের জন্য অত্যাবশ্যকীয় উপাদান (essential element) গুলোকেই উদাহরণ করছি। এদের অভাব হলে কি করি আমরা? হাওয়া থেকে নাইট্রোজেন, বা বাজার থেকে ফসফরাস বা পটাশিয়ামের দলা কিনে মাটিতে মেশাই না। এদের নানা রকম সুস্থিত যৌগ (যাদের সার বলে থাকি) মাটিতে দিই। সেগুলো মাটি-জলে বিশ্লেষিত হয়ে, মৌলগুলির যোগান দেয়। আর, গল্পটা লুকিয়ে থাকে, ওই ‘বিশ্লেষিত হওয়া’র মধ্যে। ঠিকঠাক বিশ্লেষিত না হলে, কদিনের মধ্যে, জলে ধুয়ে পুরো সার বেড়িয়ে যায় টবের তলা দিয়ে। এমনিতে আমাদের দেওয়া খাবার-সারের, মাত্র ২০-৩০% মাটিতে থাকে, বাকিটা বেরিয়ে যায়।

আসলে এন পি কে হলো, কিছু রাসায়নিক যৌগের মিশ্রণ। ওজন অনুপাতের হিসাবে নাইট্রোজেন, ফসফরাস আর পটাশিয়ামের পরিমানের উপরে নামগুলো দেওয়া হয়। ১০-২৬-২৬ মানে ১০০ গ্রাম সারে ১০ গ্রাম NH4-আয়ন/ NO2 (যা নাইট্রোজেনের উৎস), ২৬ গ্রাম P2O5 (যা ফসফরাসের উৎস) ও ২৬ গ্রাম K2O (যা পটাশিয়ামের উৎস) আছে। সাধারণ ভাবে ব্যবহৃত সারের মধ্যে উপস্থিত, গাছের প্রয়োজনীয় মৌলগুলি হল,

ইউরিয়াঃ নাইট্রোজেন আর কার্বন

অ্যামোনিয়াম সালফেট : নাইট্রোজেন আর সালফার

অ্যামোনিয়াম ফসফেট : নাইট্রোজেন আর ফসফরাস

ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডি এ পি) : নাইট্রোজেন আর ফসফরাস

পটাশিয়াম নাইট্রেট : পটাশিয়াম আর নাইট্রোজেন

পটাশিয়াম সালফেট (এস ও পি) : পটাশিয়াম আর সালফার

ক্যালশিয়াম সালফেট : ক্যালশিয়াম আর সালফার

ম্যাগনেশিয়াম সালফেট (এপসম সল্ট) : ম্যাগনেশিয়াম আর সালফার

পটাশিয়াম অক্সাইড (পটাশ) : পটাশিয়াম

মানে সব রাসায়নিক সারগুলোতে উপাদান মৌলগুলি থাকে তাদের আয়ন হিসাবে। আয়নগুলি জলে বিশ্লেষিত অবস্থায় থাকে, আর তাই মূলের মাধ্যমে গাছের শরীরে যায়। আয়ন না হলে, জলে গুলবে না। এখানেই পি এইচ ফ্যাক্টর কাজ করে।

যেমন একটু কম পি এইচে বিশ্লেষিত অবস্থায় থাকে, ফসফরাস, সালফার, কিছু ক্ষেত্রে নাইট্রোজেন, কার্বন এসব। আবার, বেশী পি এইচে থাকে নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম, ক্যালশিয়াম ইত্যাদি।

এক্ষেত্রে গাছের কী দরকার, শুধু সেটা ভাবলে হবে না। ধরা যাক, গাছের দরকার সালফার, মানে পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছে, ঝরে পড়ছে। এপসম সল্ট, পটাশিয়াম সালফেট, ক্যালসিয়াম সালফেট এসব দিতে পারি। কিন্তু, আগের দিন যদি একটু সোডা ওয়াটার দিয়ে মাটির পি এইচ হাল্কা কমিয়ে দিই, গাছ সালফারটা নেবে। না হলে কিছুতেই নিতে পারবে না। ফসফরাসের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। বাকীদের মোটামুটি ৬ এর উপরে হলেও চলে।

অতিপ্রয়োজনীয় ফসফরাস, অল্প প্রয়োজনীয় সালফার, বোরন এসবের প্রয়োগ করার সময় তাহলে একটু আম্লিক রাখতে হবে, বাকী বেশীরভাগ ৬-৬.৫ রাখতে হবে।

এবার চলে আসি তৃতীয় ধাপ, মানে মাটির অম্লতা বা ক্ষারকীয়তা কী করে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মাটির অম্লতা বা ক্ষারকীয়তা কেনই বা হয়? প্রকৃতির (বাগানের) মাটি সাধারণত একটু আম্লিক হয়, গাছের পক্ষেও এটাই দরকার। একই মাটিতে বার বার চাষ করলে, মাটির অম্লতা কমে যায়। যদিও চাষটা খুব বেশী ফ্যাক্টর নয়।

চাষের সময় যে পরিমান সার প্রয়োগ করতে থাকি, তার অল্প অংশই নেয় গাছ। বাকীটা মাটিকে খারাপ করে। একটা সময়, জমি মাঝে মাঝে পতিত রাখা হতো। মানে কয়েক বছর ধরে চাষবাস না করে, ফেলে রাখা হতো। এতে উর্বর হয় জমি। প্রধানত তার দুটি কারণ। এক, চাষ না করায় সার প্রয়োগ হয় না। উপরন্তু বৃষ্টির জল পেয়ে, কয়েক বছরে মাটি কিছুটা আম্লিক হয়। দ্বিতীয়ত, আগাছা পচে গিয়ে হিউমাস, হিউমিক অ্যাসিড এসব তৈরি হয়। এই হিউমিক অ্যাসিড, মাটির পি এইচ খুব সুন্দর নিয়ন্ত্রণ করে।

বৃষ্টির জলে মৃদু কার্বোনিক অ্যাসিড তো থাকেই। আজকাল দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায়, হাল্কা অন্যান্য কিছু অ্যাসিডও থাকে। অ্যাসিডের মাত্রা বেশি হলে, সেটাই অম্লবৃষ্টি বলে। শিল্পাঞ্চলে এই বৃষ্টি দেখা যায়। এই জন্য টবে চাষ করলে, বৃষ্টির সময়টা টব সমেত গাছ, ছাদে রাখা ভালো। ফসফরাস, সালফার, বোরনের জন্য প্রয়োজনীয় সার গুলো এই সময়ে দেওয়া লাভজনক।

অতিরিক্ত বৃষ্টি বা শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি অঞ্চলে, অ্যাসিডিক হতে হতে, মাটির পি এইচ ৫.৫ এর নিচে নেমে যায়। সেই পি এইচ মাত্রায়, গাছ বেশীরভাগ খাবার নিতে পারে না। শিকড় নষ্ট হয়ে যায়। মাটির জীবাণু মারা যায়, জৈব সারগুলো কাজ করে না। ফলে সেখানে অম্লতা কমানো দরকার। সাধারণত মাটিতে চুন দিয়ে, মাটির অম্লতা কমানো হয়। চুন কতটা দিতে হবে, সেটাও ঠিক করতে হয় বর্তমানে মাটির পি এইচ কত, সেটা জেনে নিয়ে। অতিবৃষ্টি অঞ্চলে তিন-পাঁচ বছরে একবার মাটিতে চুন দেওয়া ভালো। ৫.৫ এর নিচে পি এইচ নেমে গেলে, প্রতি কেজি মাটিতে মোটামুটি ১-২ গ্রাম চুন ভালো করে মিশিয়ে দিতে হয়। তারপর জল স্প্রে করে দিন ১৫ রাখার পর, আবার পি এইচ চেক করতে হয়। পি এইচ ৬-৬.৫ না হলে, আবার রিপিট করা দরকার।

মাটিতে সব সময় জৈব সার ও হিউমিক অ্যাসিড ব্যবহার করলে, পি এইচ প্রাকৃতিক ভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়। মাটি উর্বর থাকে, গাছ মাটি থেকে সহজেই, যে কোনো খাবার নিতে পারে।


“গাছপাকা”র তরফ থেকে খোলা চিঠি :

প্রিয় পাঠক/পাঠিকা ,

     গাছ নিয়ে আমাদের এই ওয়েবসাইটটি ভিজিট করার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আপনি আমাদের “গাছপাকা” পরিবারে যুক্ত হতে চাইলে হোয়াটস্যাপ করুন +916295614885 এই নাম্বারে। এটা হোয়াটস্যাপ অনলি নাম্বার , তাই কল করলে পাবেন না। এই নাম্বারে হোয়াটস্যাপ করলেই আমাদের হোয়াটস্যাপ ব্রডকাস্ট গ্রুপের লিংক পেয়ে যাবেন। ওখানেই টাইম টু টাইম সব আপডেট দেওয়া হয়। 

     গাছের যত্ন নিয়ে টিপস , আমাদের অনলাইন ওয়ার্কশপ হলে তার এনাউন্সমেন্ট , গাছ সেল করলে সেল রিলেটেড ইনফরমেশন , ফেসবুকে গ্রুপের কোনো ইভেন্ট হলে তার ডিটেলস , “গাছগল্প” পত্রিকার পরের এডিশন এর ডিটেলস সবকিছুই ওখানে  টাইম টু টাইম পেয়ে যাবেন। 

গাছপালা নিয়ে ভালো থাকুন , সুস্থ থাকুন। 

ইতি 

গাছপাকা 

ফেসবুক পেজ  লিংক  –> https://www.facebook.com/share/1BBaWXTPvG/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
× Whatsapp