ধরুন আপনি ভেতো বাঙালি..মানে দিনে তিনবার ভাত না খেলে , সরষের তেল দিয়ে বেগুনভাজা না খেলে , দুপুরে নাক ডাকিয়ে না ঘুমালে আপনার দিনটা ঠিকঠাক কাটে না ….সেই আপনাকে যদি কেরালার কোনো ছোট্ট গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয় আপনার কী মনে হবে জানেন?
আপনি ভাববেন “হায় ভগবান ..এ কোন জায়গায় পাঠালে!” ….. যেখানেই যাবেন নারকেল তেলের রান্না ! খেতে গেলে ওয়াক তুলে দেবেন ।
আপনি যখন কোনো গাছের ন্যাচারাল হ্যবিট্যাট না জেনে নিজের বাড়িতে আনেন তখন গাছগুলোরও এই একই অবস্থা হয় !
যেকোনো ইনডোর প্লান্টই আসলে কোনো না কোনো দেশের ন্যাচারাল প্ল্যান্ট, মানে ওই দেশে ওই গাছটা বনে জঙ্গলে আকছার হয়ে থাকতে দেখবেন! আপনি নিজেও জানেন না আপনার ঐ ছোট্ট বারান্দা বাগানে কটা দেশের গাছ আছে!
যাইহোক ,বিভিন্ন গাছের ন্যাচারাল হ্যবিট্যাট আলাদা। কেউ মরুভূমিতে জন্মায় , কেউ রেনফরেস্ট এর বিশাল বড়ো বড়ো গাছের নিচে মাটিতে জন্মায় , কেউ গাছের ডালের ওপর জন্মায়।
সবাই কিন্তু কম আলোতে থাকতে অভ্যস্ত না , আবার সবাই সারাদিন খোলা জায়গায় সূর্যের রোদ খেতেও অভ্যস্ত না। তাই এই আলো জিনিসটা খুব খুব ভালোভাবে বোঝা দরকার। অনেকেই এই জিনিসটাকে ঠিকঠাক বোঝেন না ।
পট , মিডিয়া , জল , সার , ওষুধ সব ম্যানেজ করে নিতে পারবেন, বাড়িতে না থাকলে অন্য জায়গা থেকে কিনে আনতে পারবেন….কিন্তু সূর্যের রোদ বা আলোকে ম্যানেজ করাটা মুশকিল …খুব মুস্কিল!
আপনার বাড়িতে সূর্যের আলো না ঢুকলে অন্য কোথাও থেকে সূর্যের আলো কিনে আনতে পারবেন না।
তাই ছাদবাগানের তৃতীয় ভুলটি হলো আলোকে underestimate করা!
তাহলে আপনার বাড়িতে রোদ না ঢুকলে আপনি কী ইনডোর গাছ করবেন না ? গাছ করার শখ গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেবেন?
এইখানেই অনেকে ভুল করেন। পৃথিবীতে কয়েক লক্ষ প্রজাতির ইনডোর প্ল্যান্ট আছে। বেছে বেছে সেই গাছগুলো কিনে আপনার বাড়িতে আনুন যেগুলো রোদ থেকে দূরে ভালো থাকে…. ইনফ্যাক্ট রেন ফরেস্ট এর মাটিতে যে গাছগুলো জন্মায় সেইগুলো কিন্তু আপনার পরিবেশে ভালো থাকবে ।
তাই আপনার বাড়িতে রোদ না ঢুকলেও আপনি আপনার বাড়িটাকে ইনডোর প্ল্যান্ট দিয়ে জঙ্গল বানিয়ে নিতে পারেন ।
তবে, একদম অন্ধকারে কোনো গাছই খুব একটা ভালো থাকে না । তাই গাছ করতে গেলে সারাদিন উজ্জ্বল আলোটা থাকা খুব দরকার ।
কোনটা direct sunlight, কোনটা indieect bright light, কোনটা medium বা low বা extra low light এই ধারণাটা খুব ক্লিয়ার থাকা দরকার।
অনেককেই দেখি জবা , গোলাপ এগুলো বারান্দায় রাখেন । ভুল করেন , খুব ভুল করেন ।এগুলো আসলে ফুল আউটডোর প্ল্যান্ট , মানে সারাদিন খোলা আকাশের নিচে থাকলে এরা ভালো থাকে ।
তাই বারান্দায় রাখতে চাইলে এমন জায়গায় রাখুন যেখানে অন্তত সরাসরি 4/5ঘণ্টা রোদ পাবে।
আলো নিয়ে কিছু পয়েন্ট সবসময় মাথায় রাখবেন –
১. গাছ কেনার আগে একবার হলেও ভাবুন যেখানে গাছ রাখবেন বলে মনস্থির করেছেন সেখানে আলো কেমন আসে, সেটা বুঝে তারপর সেই আলোতে যে গাছগুলো ভালো থাকে সেরকম গাছ কিনুন।
যেকোনো গাছ কিনে এনে যেখানে ইচ্ছা রেখে দিলে গাছ ভালো থাকবে না।
২. যেখানে গাছ রাখছেন সেই জায়গার আলো , গাছটার ন্যাচারাল হ্যবিট্যাট এ যেরকম আলো পায় তার মিনিমাম অন্তত ৬০-৭০% হওয়াটা দরকার।
৩. ইনডোর কন্ডিশনে কোনো একটা জায়গার আলো দিনের সময় অনুযায়ী ,ঋতু অনুযায়ী বদলায় । এটা মাথায় রাখুন।
একই জায়গায় আলো সকাল নয়টায় আর বিকাল পাঁচটায় এক রকম থাকে না , গ্রীষ্মকালে আর শীতকালে এক থাকে না।
৪. আলো কম থাকলে জল কম দিন । যেখানে আলো কম সেখানে জল শুকাবে ধীরে ধীরে।
আলো কম থাকলে প্লাস্টিকের পট ব্যবহার করবেন না । এতে জল শুকায় অনেক ধীরে ধীরে। এই জায়গায় মাটির পট ব্যবহার করুন।
৫.গাছ আলো কম পাচ্ছে কিনা বোঝার উপায় আছে। আলো কম পেলে গাছ লম্বা হয়ে যাবে, ব্রাঞ্চ কম বেরোবে।
৬. আলো বেশি হলে পাতাতে সানবার্ন এসে যায়। ফোস্কা পড়ার মতো দেখতে লাগে।
৭. আলো খুব কম বা খুব বেশি হলে গাছ স্ট্রেস নিয়ে নেয়। এটা থেকে রিকভারি করতে গেলে আপনাকে ধীরে ধীরে তাকে সঠিক আলোতে নিয়ে যেতে হবে। দুম করে আলো কম বা বেশি হলে গাছ আরো ড্যামেজ হবে।
৮. আলো কম থাকলে কৃত্রিম আলো ব্যবহার করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ফুল স্পেকট্রাম গ্রো লাইট কিনবেন । তবে কৃত্রিম আলো কখনোই ন্যাচারাল লাইটের সাবস্টিটিউট না। গাছগুলো খানিকটা ভালো থাকবে এই যা।
৯. বৃষ্টির পর চড়া রোদ যেকোনো গাছের জন্য খুব খুব খারাপ।
১০. সকালের রোদ যেকোনো গাছের জন্য ভালো। বিকেলের রোদ অর্কিডের জন্য খুব একটা ভালো না।
১১. খোলা ছাদে ইনডোর গাছ করতে গেলে বা অর্কিড করতে হলে agri নেট ব্যবহার করতে পারেন।
১২. গাছের গোড়া সবসময় পরিষ্কার রাখবেন। মাটি থেকে অন্তত তিন বা চার ইঞ্চি কোনো ডালপালা যেনো না থাকে। এটা করলে স্টেম রুট জংশন হেলদি থাকে। গাছের গোড়ায় যে সমস্যা গুলো হয় সেগুলো অনেক কম হবে।
১৩. ইনডোর গাছে সাধারনত একদিক থেকে আলো পায়, তাই যেদিক থেকে আলো আসে সেইদিকে গাছ বেঁকে যায়। তাই মাঝেমধ্যে গাছটাকে একটু করে ঘুরিয়ে দিলে গাছের শেপ নষ্ট হবে না।
১৪. গাছ আলো কম পাচ্ছে , সেই অবস্থায় যদি জল বেশি হয়ে যায় , গাছের কন্ডিশন খুব দ্রুত খারাপ হয়।
১৫. সকালে গাছ বারান্দায় , বিকালে টেবিলের ওপর …..এরকম ভাবে বারবার গাছের স্থান পরিবর্তন করলে গাছের গ্রোথ কমে যায়।
১৬. সরাসরি সূর্যের রোদ আর জানলার কাঁচের মধ্যে দিয়ে আসা রোদ এক না।
আপনি যদি একটা গাছকে আলো ঠিকঠাক দিতে পারেন গাছ আপনাকে ফুলে ফলে ভরিয়ে দেবে। আর আলো ঠিক না থাকলে যতই সার দিন , কোনোদিনই সেইভাবে ফুল পাবেন না।
আলোকে কখনো আন্ডারএস্টিমেট করবেন না। আলোর বিপরীতে গাছ করা মানে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। এতে সফল হওয়া খুব খুব কঠিন কাজ।
পোস্টটা কাজে লাগলে শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রেখে দিতে পারেন যাতে প্রয়োজনের সময় খুঁজে পেতে সুবিধা হয়।
কোনো প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানান।
গাছপালা নিয়ে ভালো থাকুন 🙏
লেখক/লেখিকা ~ গাছপাকা
“গাছপাকা”র তরফ থেকে খোলা চিঠি :
প্রিয় পাঠক/পাঠিকা ,
গাছ নিয়ে আমাদের এই ওয়েবসাইটটি ভিজিট করার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আপনি আমাদের “গাছপাকা” পরিবারে যুক্ত হতে চাইলে হোয়াটস্যাপ করুন +916295614885 এই নাম্বারে। এটা হোয়াটস্যাপ অনলি নাম্বার , তাই কল করলে পাবেন না। এই নাম্বারে হোয়াটস্যাপ করলেই আমাদের হোয়াটস্যাপ ব্রডকাস্ট গ্রুপের লিংক পেয়ে যাবেন। ওখানেই টাইম টু টাইম সব আপডেট দেওয়া হয়।
গাছের যত্ন নিয়ে টিপস , আমাদের অনলাইন ওয়ার্কশপ হলে তার এনাউন্সমেন্ট , গাছ সেল করলে সেল রিলেটেড ইনফরমেশন , ফেসবুকে গ্রুপের কোনো ইভেন্ট হলে তার ডিটেলস , “গাছগল্প” পত্রিকার পরের এডিশন এর ডিটেলস সবকিছুই ওখানে টাইম টু টাইম পেয়ে যাবেন।
গাছপালা নিয়ে ভালো থাকুন , সুস্থ থাকুন।
ইতি
গাছপাকা
ফেসবুক পেজ লিংক –> https://www.facebook.com/share/1BBaWXTPvG/